বাংলায় আমরা যে কালী পূজা করি, তা এই কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের থেকেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

লজ্জায় জিভ কাটলেন নগ্ন গোপরমনী।
সৃষ্টি হলেন আগমবাগীশের ব্রহ্মময়ী মা কালী।।

পূর্বে দেবী কালিকা গৃহদেবী হিসেবে পূজিতা হতেন না, তিনি ছিলেন শ্মশানচারিণী এবং তান্ত্রিকদের দেবী। কাপালিক, ডাকাত ও তান্ত্রিকরা নির্জন শ্মশানে, বনে-জঙ্গলে এই মায়ের আরাধনা করতেন। এই কালী দেবী ছিলেন শ্মশানচারিণী, ভয়ঙ্কররুপি, শুধুমাত্র তন্ত্রাচারেই তিনি পূজিতা হতেন। তাঁর রূপ ছিল ভীষন-বদনা, মুণ্ডমালা শোভিতা, রক্ত-পিপাসী, উগ্ররুপা। তাঁর সামনে নিয়মিত পশুবলি এমনকি নরবলি দেওয়া হত। মহেঞ্জোদারো সভ্যতা থেকে যে চতুর্ভুজা দেবীমূর্তি পাওয়া গেছে তাঁর সঙ্গে আমাদের এই শাস্ত্রীয় কালীমূর্তির হুবহু মিল রয়েছে।

প্রাচীনকাল থেকে তন্ত্র ও বৈষ্ণবধর্মের মূল পীঠস্থান ছিল নদীয়ার নবদ্বীপ। তবে, তন্ত্রসাধনা এবং দেবী কালিকার ভয়াল মূর্তি গৃহবাসীর আতঙ্ক বা ভয়ের কারণ ছিল। তাই শক্তি আরাধনা থেকে গৃহবাসী অনেক দুরে থাকতেন। তন্ত্রসাধক ও পণ্ডিত নবদ্বীপের কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কিছুতেই তাঁর মাতৃস্বরূপা ইস্টদেবীর এই ভয়াল রূপটি কল্পনা করতে পারতেন না। তিনি শক্তিদেবীর কোমল গৃহীরূপ সৃষ্টিতে বিভোর ছিলেন। অবশেষে, তিনি স্বপ্নে মায়ের আদেশ পেলেন ভক্তের মধ্যেই ভগবান বিরাজমান। ঘুম থেকে উঠে তিনি যে নারীকে প্রথম দেখবেন, সেই নারীর রূপই হবে দেবীর জাগতিক রূপ। ভোরের প্রথম আলোতেই খুঁজে পাওয়া যাবে দেবী মায়ের স্নিগ্ধ ব্রহ্মময়ী রূপ। স্বপ্নাদেশ পেয়ে ঘুম ভেঙে যায় কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশের। তিনি ভোর হওয়ার কিছু পূর্বেই গোপপল্লী দিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন গঙ্গার ঘাটের দিকে। আচমকা এক গোপ গৃহবধূকে দেখে দাড়িয়ে পড়েন এই তন্ত্রসাধক। এই গোপ গৃহবধূর গায়ের রং শ্যামলা, রুপ-লাবণ্যে এক অপরুপা রমণী। তাঁর ডান পা সামান্য বাড়িয়ে বাঁ হাত দিয়ে কুটীরের দেওয়ালে গোবরের প্রলেপ দিচ্ছেন। রমণীর পরনে রয়েছে ছোট্ট একটি লাল পাড়ের কাপড়, খোলা চুল কোমর অবধি বিস্তীর্ণ। এক অপরুপা রমণী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কৃষ্ণানন্দ তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারেন যে এই রমণীই তাঁর মৃন্ময়ী মা। একটু এগিয়ে যান এই রমণীর দিকে। আগমবাগীশকে দেখেই রমনী তার স্বল্প পোশাক কিছুটা ঠিক করতে গেলেই ঘটে যায় আরেক বিপত্তি, রমণীর পরনের পোশাকটি খুলে নিচে পড়ে যায়। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে এই রমণী কৃষ্ণানন্দকে দেখেই লজ্জায় জিভ বার করেন। সাধক কৃষ্ণানন্দ প্রাণ ভরে এই মায়ের মৃন্ময়ী রূপ দেখতে থাকলেন। এরপর গঙ্গামাটি দিয়ে কৃষ্ণানন্দ তৈরি করলেন তাঁর আরাধ্যা মায়ের স্নিগ্ধ মৃন্ময়ী রূপ যা ‘দক্ষিণা কালী’ নামে পরিচিত। কৃষ্ণানন্দ দক্ষিণা কালী প্রতিবছর দীপান্বিতা অমাবস্যাতেই নবদ্বীপে পূজা করতেন এবং ভোরবেলায় এই মূর্তির বিসর্জন দিতেন। কালীপূজা সর্বত্র তন্ত্রমতে হলেও কৃষ্ণানন্দের পূজা হয় সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে, এখানে কোনো বলি প্রথার প্রচলন নেই। আজও প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে এই পূজা হয়ে আসছে।

বাংলায় আমরা যে কালী পূজা করি, তা এই কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের থেকেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তন্ত্রসাধনায় আগম পদ্ধতিতে সিদ্ধিলাভ করায় কৃষ্ণানন্দ আগম্বাগিশ উপাধি পান। তন্ত্র শাস্ত্রে সুপণ্ডিত তন্ত্রসাধক আগমবাগীশ ভারত বর্ষ, নেপালের ও বৌদ্ধতন্ত্রের প্রায় ১৭০ টি বইয়ের নির্যাস থেকে তন্ত্রবিদ্যার একটি উৎকৃষ্ট সম্পদ ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ গ্রন্থটি রচনা করেন। এই গ্রন্থ তন্ত্রসাধনার একটি অমূল্য সম্পদ।।

সুরথ চক্রবর্ত্তী।
বাংলার মন্দির ও শিল্পের ইতিহাস

Sharing is caring!